RSS

চল্লিশ পেরোলেই চালশে?

21 আগস্ট

আমরা বার্ধক্যকে বড় ভয় পাই। ‘বাঘে যদি ধরে, গুপী যদি মরে’, মানে থুত্থুরে বুড়ো হয়ে যাব, চুল পড়ে যাবে, ফোকলা দাঁতে মুরগীর ঠ্যাং চেবাতে পারব না, পেটেও আর পাঁঠার মাংস সইবে না, এইসব চিন্তা আমাদের বুঝি সদাই তাড়িয়ে বেড়ায়। কথাটা মনে ধরল না? ভালো করে কথাটা মাথায় উল্টে, পালটে, ঠুকে, বাজিয়ে, খেলিয়ে দেখুন না একবার?

যদি ভয় না পেতাম তাহলে চারিপাশে এত চল্লিশ-পেরোলেই-চালশেদের – হ্যাঁ, হ্যাঁ, সাহেব, বিবি, গোলাম – সব্বার মধ্যে মসৃণ, নিভাঁজ ত্বক-এর জন্য স্কিন রেজুভেনেটিং ক্রিম, মুখের জেল্লা যাতে ‘ফরেভার টোয়েন্টি ওয়ান’ থাকে তার জন্য নানা লোশন/ময়শ্চারাইজার/আন্ডার আই ক্রিম, বোটক্স, কোমর দেখে যাতে মনে হয় ‘সুইট সিক্সটিন’ তার জন্য লাইপোসাকশান নাহলে সকালে পাড়ার পার্কে পনেরো পাক মর্নিং ওয়াক। তাছাড়া চুলে রঙ, দাঁতে ক্যাপিং/পলিশিং/ফিলিং/ফাইলিং, মাসে দুবার স্পা, ফেসিয়াল, মাস্ক, ম্যানিকিওর/ পেডিকিওর ইত্যাদির এতো রমরমা কেন? তার্কিকেরা অবশ্য নাক বেঁকিয়ে, চোখ পাকিয়ে বলবেই যে এ তো যারা হেডোনিস্টিক, বা বাহ্যিক রূপটাই যাদের কাছে প্রধান, এসব তাদের অ-সুখ, শ্যালো মেন্টালিটি ও দুর্বলতার পরিচয়।

 তাই যদি হয়, তাহলে যাঁরা আপাতদৃষ্টিতে অ-সুখী নন, যাঁরা ‘সিম্পল লিভিং, হাই থিঙ্কিং’-এ বিশ্বাসী বা একটু আঁতেল, জ্ঞানীগুনী ধরনের, তাঁদের কথায় আড়ি পেতে দেখুন না? কেউ ভাবিত, ‘ভিটামিন ডি-র লেভেলটা মনে হচ্ছে একটু কমের দিকে’। কারও মতে,  ‘পঁয়ত্রিশ পেরোলেই ছ’মাস অন্তর এগজেকিউটিভ মেডিক্যাল চেক আপটা রুটিনের মধ্যে এনে ফেলাটা অত্যন্ত দরকার’। ‘শরীরটা রাখতে হবে তো, ভিটামিন আর এসেন্সিয়াল মিনারেল সাপ্লিমেন্ট নাহলে শরীরে খুব তাড়াতাড়ি ক্ষয় ধরবে’। সেদিন বিকেলে এক পাড়াতুতো বান্ধবীর সাথে দেখা। সাথে পনের বছরের মেয়ে, দাঁতে ব্রেস পরানো। নিজেও দেখি কেমন যেন দাঁত চেপে কথা বলছে। কেন? সকালবেলায় ডেন্টিস্টের কাছে গিয়ে ফাইলিং, সেটিং, প্লাক ক্লিনিং-এর মত কত কি সব খটোমটো কাজকর্ম করিয়ে এসেছে। মন ফিসফিস করে বলল, ‘গত তেতাল্লিস বছরের জমা জঙ্গল সাফ করানো, আর কী?’

আর যারা একটু সাত্বিক প্রকৃতির? সাধনা, ভজনা, কীর্তন, সৎসঙ্গ, বারো মাসে তেরো পার্বণে ছাব্বিশ রকমের উপবাস। সবকিছু কিন্তু সেই একই জায়গায় এসে ভিড়ছে। সবার কামনা একটাই, যত বয়স বাড়বে, রূপে, যৌবনে, স্বাস্থ্যে, পূণ্যে আমার জীবন পরিপূর্ন হয়ে উঠবে, ও জরা, ব্যাধি, এবং বিষেশত বার্দ্ধক্য আমার থেকে দূরে পালাবে।

রবি ঠাকুর বলে গেছেন, “ওই যে প্রবীণ, ওই যে পরম পাকা,/ চক্ষুকর্ণ দুইটি ডানায় ঢাকা,/ ঝিমায় যেন চিত্রপটে আঁকা / অন্ধকারে বন্ধ করা খাঁচায়।”

খুব আশ্চর্য লাগে এই ভেবে যে মাঝবয়স থেকেই সবাই কেমন দিশাহারা হয়ে পড়ে – এই বুঝি ওপারের ডাক পড়ল। একজনের মুখে এও শুনেছি, ‘বাহ! পঞ্চাশ মানেই তো জীবনের ইতি। ষাট-সত্তর হল উপরি পাওনা, বুঝলে?’ তাঁর বয়স? বরজোর পঁয়তাল্লিশ-ছেচল্লিশ। কত লোকে আজকাল চল্লিশের ওপারে জীবন নিয়ে তো বই, ব্লগ, গদ্য, পদ্য কত কি রচনা কর ফেলছে। আবার কারও চুয়াল্লিশে পড়ে মনে পড়ছে যে চুরাশি কেজি বপুটি চৌষট্টিতে না নামাতে পারলে একে একে শরীরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জবাব দিতে আরম্ভ করবে।

কেন এই হতাশা? কিসের ভিতি? কাল আমার জীবনের শেষ দিন হতেই পারে, কিন্তু তার জন্যে আজ থেকে মরে বাঁচতে হবে কেন?

‘জ্ঞান একটু বেশী দেওয়া হয়ে গেল না?’ মন আমার ঘাড় ব্যাঁকাল। ‘এই নাকি তুমি জ্ঞান দাও না? এখানে জ্ঞান জাহির করবে না? জ্ঞান সমুদ্দুরের পাড়ে বসে কেবল নাকি পা দোলাবে? তাহলে কে কিসে ভয় পায়, কার কী দুর্বলতা, কে কী ভাবে জোয়ান থাকার চেষ্টায় মরিয়া, তা নিয়ে তোমার এত মাথা ব্যাথা কেন?’ কথাটা ঠিক। জ্ঞান দেবার প্রচেষ্টা আমার বিন্দুমাত্র নয়। শুধু অবাক লাগে আর অদম্য ইচ্ছে জাগে জানার যে কী ভেবে বুড়ো বয়সকে মানুষ এতো ভয় পায়? অথর্ব হয়ে পড়বে ভেবে? নিঃসহায়, একাকীত্বের জীবন যাপন করতে হবে বলে? রোগ, জরাকে? নাকি অবশ্যসম্ভাবী সেই দিনের কথা ভেবে, যেদিন সবকিছু ফেলে বিলীন হয়ে যেতে হবে লীনে?

‘এতসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো তোমার পাঠক দেবে। তবে ওষুধের হদিশটা আমি বলে দিতে পারি’ বলে মন বুড়ো আঙ্গুলটা নাড়াল, ‘বুড়ো বয়সকে কাঁচকলা দেখাতে পারলেই তো কেল্লা ফতে। চুলে পাক ধরবেই, প্রকৃতির নিয়মে শরীরেও ভাঙ্গন ধরবে, চামড়া কুঁচকে, ঝুলে পড়বে, একটা দুটো করে দাঁত নড়বে আর টুপটাপ খসে পড়বে। তাহলে আসল চাবিকাঠিটি কই? এই আমি, তোমার মন, আমি হলাম চির যৌবনের চাবিকাঠি। আমি তরতাজা, নির্ভীক, নিরুদ্বিগ্ন থাকলেই তুমি “নবীন … আমার কাঁচা”।

তাই বলি কী, মনের জানালাটা খোলা রেখো, বুঝলে ফেলু?” মন বলল, সিধুজ্যাঠার স্টাইলে।

 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: