RSS

চাঁপা ফুলগুলো…

বুড়ো বৃষ্টিভেজা একটা মুচকি হাসি হেসে বলল, ‘সবকো তিশ রুপয়া মে দসঠো দে রাহা হুঁ, আপ বারা লে যাও’। বলে একটা কাঁচা শালপাতায় পনেরোটা সদ্য ফোটা শীতের নরম রোদের মত কুসুম রঙ্গা ফুল মুড়ে, ভেজা সাদা সুতোর রিলটা থেকে খানিকটা সুতো দিয়ে জড়িয়ে, আমার হাতে ধরিয়ে দিলো।

‘বারা? আপনে তো পনদ্রা দিয়া?’ বুড়ো আগেও এক দিন এইরকম কাজ করেছিল, আমার দেওয়া একশো টাকা থেকে চল্লিশ টাকা কাটার কথা, ফেরত দিলো আশি টাকা। আবার তাকে প্রায় অঙ্ক কষে হিসেব মত টাকা দিয়ে এসেছিলাম।

আমার পাড়ার আকাশছোঁয়া বাড়িগুলোর গোড়ালির কাছে একটা ছোট্টো বাজার আছে। চটজলদির সব পাওয়া যায় – রোজনামচার চাল, ডাল, শাকসব্জি, ফল, মিষ্টিমন্ডা, জলখাবারের টুকিটাকি, ওষুধপত্র, খাতা পেনসিল, ফুল – খুব দরকার পড়লে বোধহয় বাঘের দুধও। তাই নানা কারণে, অকারণে ও পথে আমার যাতায়াত লেগেই থাকে।

এক এক সময় সন্ধ্যা নামার মুখে পৌঁছলে, খবরের কাগজের স্টলটার গা ঘেঁষা, নীচু চওড়া পাঁচিলটার উপর বসে থাকতে দেখি ওই ফুলওয়ালা বুড়োকে। একটা মাঝারি ঝুড়িতে মরসুমি ফুল সাজিয়ে ওই পাঁচিলের উপর বেচতে বসে। গনগনে গরমের পড়ে আসা বেলায় বেল আর জুঁইয়ের মোটা মোটা ‘গজরা’ আর ঝুরো বেল।

সেদিন, এই ঘোর বর্ষার ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরা সাঁঝে দেখি একটা বড় কালো ছাতার তলায় বসে আছে ফুলের ঝুড়ি নিয়ে। আমায় দেখে মুচক হেসে, হাত নেড়ে ডাকল। এগিয়ে গেলাম। ঝুড়ির একধারে বড় বড় বেলফুলের গজরা আর তার সাথে নরম, কুসুম রঙা কী জানি এক ফুল। বড় সুন্দর ‘খোশবাই’। ওটা আমার

ওটা আমার ঠাকুমার বলা কথা, নাম না জানা ফুলটার গন্ধে মনে পড়ে গেল।

‘দিদি, দেখো আজ চম্পা লায়া, বহুত বড়িয়া খুসবু হ্যায়, আপ আজ মোগরা মত লো, আপ চম্পা লে যাও’ আবদারের সুরে বলল সে। যেখানটায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেখানকার ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ভেজা বাতাস চাঁপা ফুলের গন্ধে তখন আরও ভারী হয়ে উঠছে।

champa

ইঁট বের করা, কেঠো, পলেস্তারা খসে পড়া শহরে বড় হয়েছি তো, তাই চাঁপাফুলের কথা অনেক শুনে, বইএ পড়ে চিনেছি, চোখে দেখিনি। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়? কলকাতায় কিন্তু চাঁপা ফুলের গাছ আমার চোখে কোনদিন পড়েনি।

বেশ বুঝলাম চাঁপার পাগল করা মিষ্টি গন্ধটা আমাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরছে, ভেসে যেতে ডাকছে। কবিরা চাঁপার সুবাস নিয়ে কেন এত উদ্বেলিত, তাও এবার বেশ বুঝলাম। তাই বুড়োর আবদার রাখলাম। সে আমায় তিরিশ টাকায় পনেরোটা ফুল দেবেই, বকে ঝকে পঁয়তিরিশ টাকা দিয়ে ফেরার পথে হাঁটা দিলাম।

আজকাল মাঝেমাঝেই সন্ধ্যার মুখোমুখি বাজারে যাই, বিনা কারণে, কখনো বৃষ্টি মাথায় করেই। ফিরে আসি এক মুঠো চাঁপা ফুল হাতে। রাতের দিকে যখন ঝেঁপে বৃষ্টি নামে, আমাদের পঁচিশ তলার বারান্দার দরজাটা খুলে, অন্ধকারে বসে থাকি দরজার সামনে। আঁধারের ওপারে আলোর মালা, অনেক নীচে বাড়িগুলোয় কমতে থাকে বাতি – আমি বসে দেখি আর গান শুনি। ভেজা হাওয়ায় টেবিলে কাঁচের রেকাবিতে রাখা চাঁপাগুলো ভাসিয়ে দেয় তাদের খোশবাই, লুটিয়ে পড়ে আমার চোখে, মুখে, চুলে। এতোদিন বাদে আলাপ তো, তাই আঁধারের আড়ালে বসে বন্ধুত্বের সম্পর্কটাকে একটু, একটু করে গাঢ় করি, আমি আর চাঁপা ফুলগুলো।

picture courtesy : http://www.flickr.com/photos/kgabhi/5643382020/ 
Advertisements
 

চল্লিশ পেরোলেই চালশে?

আমরা বার্ধক্যকে বড় ভয় পাই। ‘বাঘে যদি ধরে, গুপী যদি মরে’, মানে থুত্থুরে বুড়ো হয়ে যাব, চুল পড়ে যাবে, ফোকলা দাঁতে মুরগীর ঠ্যাং চেবাতে পারব না, পেটেও আর পাঁঠার মাংস সইবে না, এইসব চিন্তা আমাদের বুঝি সদাই তাড়িয়ে বেড়ায়। কথাটা মনে ধরল না? ভালো করে কথাটা মাথায় উল্টে, পালটে, ঠুকে, বাজিয়ে, খেলিয়ে দেখুন না একবার?

যদি ভয় না পেতাম তাহলে চারিপাশে এত চল্লিশ-পেরোলেই-চালশেদের – হ্যাঁ, হ্যাঁ, সাহেব, বিবি, গোলাম – সব্বার মধ্যে মসৃণ, নিভাঁজ ত্বক-এর জন্য স্কিন রেজুভেনেটিং ক্রিম, মুখের জেল্লা যাতে ‘ফরেভার টোয়েন্টি ওয়ান’ থাকে তার জন্য নানা লোশন/ময়শ্চারাইজার/আন্ডার আই ক্রিম, বোটক্স, কোমর দেখে যাতে মনে হয় ‘সুইট সিক্সটিন’ তার জন্য লাইপোসাকশান নাহলে সকালে পাড়ার পার্কে পনেরো পাক মর্নিং ওয়াক। তাছাড়া চুলে রঙ, দাঁতে ক্যাপিং/পলিশিং/ফিলিং/ফাইলিং, মাসে দুবার স্পা, ফেসিয়াল, মাস্ক, ম্যানিকিওর/ পেডিকিওর ইত্যাদির এতো রমরমা কেন? তার্কিকেরা অবশ্য নাক বেঁকিয়ে, চোখ পাকিয়ে বলবেই যে এ তো যারা হেডোনিস্টিক, বা বাহ্যিক রূপটাই যাদের কাছে প্রধান, এসব তাদের অ-সুখ, শ্যালো মেন্টালিটি ও দুর্বলতার পরিচয়।

 তাই যদি হয়, তাহলে যাঁরা আপাতদৃষ্টিতে অ-সুখী নন, যাঁরা ‘সিম্পল লিভিং, হাই থিঙ্কিং’-এ বিশ্বাসী বা একটু আঁতেল, জ্ঞানীগুনী ধরনের, তাঁদের কথায় আড়ি পেতে দেখুন না? কেউ ভাবিত, ‘ভিটামিন ডি-র লেভেলটা মনে হচ্ছে একটু কমের দিকে’। কারও মতে,  ‘পঁয়ত্রিশ পেরোলেই ছ’মাস অন্তর এগজেকিউটিভ মেডিক্যাল চেক আপটা রুটিনের মধ্যে এনে ফেলাটা অত্যন্ত দরকার’। ‘শরীরটা রাখতে হবে তো, ভিটামিন আর এসেন্সিয়াল মিনারেল সাপ্লিমেন্ট নাহলে শরীরে খুব তাড়াতাড়ি ক্ষয় ধরবে’। সেদিন বিকেলে এক পাড়াতুতো বান্ধবীর সাথে দেখা। সাথে পনের বছরের মেয়ে, দাঁতে ব্রেস পরানো। নিজেও দেখি কেমন যেন দাঁত চেপে কথা বলছে। কেন? সকালবেলায় ডেন্টিস্টের কাছে গিয়ে ফাইলিং, সেটিং, প্লাক ক্লিনিং-এর মত কত কি সব খটোমটো কাজকর্ম করিয়ে এসেছে। মন ফিসফিস করে বলল, ‘গত তেতাল্লিস বছরের জমা জঙ্গল সাফ করানো, আর কী?’

আর যারা একটু সাত্বিক প্রকৃতির? সাধনা, ভজনা, কীর্তন, সৎসঙ্গ, বারো মাসে তেরো পার্বণে ছাব্বিশ রকমের উপবাস। সবকিছু কিন্তু সেই একই জায়গায় এসে ভিড়ছে। সবার কামনা একটাই, যত বয়স বাড়বে, রূপে, যৌবনে, স্বাস্থ্যে, পূণ্যে আমার জীবন পরিপূর্ন হয়ে উঠবে, ও জরা, ব্যাধি, এবং বিষেশত বার্দ্ধক্য আমার থেকে দূরে পালাবে।

রবি ঠাকুর বলে গেছেন, “ওই যে প্রবীণ, ওই যে পরম পাকা,/ চক্ষুকর্ণ দুইটি ডানায় ঢাকা,/ ঝিমায় যেন চিত্রপটে আঁকা / অন্ধকারে বন্ধ করা খাঁচায়।”

খুব আশ্চর্য লাগে এই ভেবে যে মাঝবয়স থেকেই সবাই কেমন দিশাহারা হয়ে পড়ে – এই বুঝি ওপারের ডাক পড়ল। একজনের মুখে এও শুনেছি, ‘বাহ! পঞ্চাশ মানেই তো জীবনের ইতি। ষাট-সত্তর হল উপরি পাওনা, বুঝলে?’ তাঁর বয়স? বরজোর পঁয়তাল্লিশ-ছেচল্লিশ। কত লোকে আজকাল চল্লিশের ওপারে জীবন নিয়ে তো বই, ব্লগ, গদ্য, পদ্য কত কি রচনা কর ফেলছে। আবার কারও চুয়াল্লিশে পড়ে মনে পড়ছে যে চুরাশি কেজি বপুটি চৌষট্টিতে না নামাতে পারলে একে একে শরীরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জবাব দিতে আরম্ভ করবে।

কেন এই হতাশা? কিসের ভিতি? কাল আমার জীবনের শেষ দিন হতেই পারে, কিন্তু তার জন্যে আজ থেকে মরে বাঁচতে হবে কেন?

‘জ্ঞান একটু বেশী দেওয়া হয়ে গেল না?’ মন আমার ঘাড় ব্যাঁকাল। ‘এই নাকি তুমি জ্ঞান দাও না? এখানে জ্ঞান জাহির করবে না? জ্ঞান সমুদ্দুরের পাড়ে বসে কেবল নাকি পা দোলাবে? তাহলে কে কিসে ভয় পায়, কার কী দুর্বলতা, কে কী ভাবে জোয়ান থাকার চেষ্টায় মরিয়া, তা নিয়ে তোমার এত মাথা ব্যাথা কেন?’ কথাটা ঠিক। জ্ঞান দেবার প্রচেষ্টা আমার বিন্দুমাত্র নয়। শুধু অবাক লাগে আর অদম্য ইচ্ছে জাগে জানার যে কী ভেবে বুড়ো বয়সকে মানুষ এতো ভয় পায়? অথর্ব হয়ে পড়বে ভেবে? নিঃসহায়, একাকীত্বের জীবন যাপন করতে হবে বলে? রোগ, জরাকে? নাকি অবশ্যসম্ভাবী সেই দিনের কথা ভেবে, যেদিন সবকিছু ফেলে বিলীন হয়ে যেতে হবে লীনে?

‘এতসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো তোমার পাঠক দেবে। তবে ওষুধের হদিশটা আমি বলে দিতে পারি’ বলে মন বুড়ো আঙ্গুলটা নাড়াল, ‘বুড়ো বয়সকে কাঁচকলা দেখাতে পারলেই তো কেল্লা ফতে। চুলে পাক ধরবেই, প্রকৃতির নিয়মে শরীরেও ভাঙ্গন ধরবে, চামড়া কুঁচকে, ঝুলে পড়বে, একটা দুটো করে দাঁত নড়বে আর টুপটাপ খসে পড়বে। তাহলে আসল চাবিকাঠিটি কই? এই আমি, তোমার মন, আমি হলাম চির যৌবনের চাবিকাঠি। আমি তরতাজা, নির্ভীক, নিরুদ্বিগ্ন থাকলেই তুমি “নবীন … আমার কাঁচা”।

তাই বলি কী, মনের জানালাটা খোলা রেখো, বুঝলে ফেলু?” মন বলল, সিধুজ্যাঠার স্টাইলে।

 

শতরঞ্জ কী আনাড়ি

আমার এই সময় ব্লগ, শতরঞ্জ কে আনাড়ির পাতা থেকে ঃ

সদ্য আসন্ন হেমন্তের টুপটাপ পাতা খসানো একটা দিনে, জুরিখের ছোট্ট একটা পার্কে দাঁড়িয়েছিলাম। গেটের সামনেই মাটিতে একটা ছোট চৌকো শান বাঁধানো জায়গা, কতকাল আগেকার সাদা কালো টালি বসিয়ে দাবার ছক বানান। কাঠের ঘুঁটিগুলো বেশ সুন্দর, মাপে এক থেকে দেড় ফুট মত। বিকেলের ঢলে পড়া রোদে পিঠ দিয়ে দুই বৃদ্ধ সেই ছকের মাঝে দাঁড়িয়ে রাজা, রানী, গজ, বোড়ে নিয়ে যুদ্ধ করে চলেছে। আমি দাঁড়িয়ে দেখলাম খানিক, ছবিও তুললাম কটা।

chess players

মন গুরুগম্ভীর সুরে শুধালো, ‘শেখা হয়েছিল দাবা? ছবিগুলো ফেসবুকে লাগিয়ে কি জ্ঞান জাহির করবে শুনি?’ বাবা কিছুদিন চেষ্টা করেছিলেন বটে এবং পরবর্তী কালে আমার পতিদেবও, কিন্তু আমার বেহিসাবি মনের কাছে হার স্বীকার করতে হয়ে দুজনকেই। আমি এখনও তাই শতরঞ্জ কি আনাড়ি।

নাহ, ব্লগের নামটা আমি ধাঁ করে দিয়ে ফেলিনি। নিজেকে নিয়ে অনেক চিন্তা ভাবনা, পড়াশোনা করে, নিজের সাথে নানা তর্ক বিতর্ক করেই এই নামে সায় দিয়েছি। মনও উপায় না দেখে, ফোঁস করে বিরাট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেনে নিয়েছে।

তো, আপনি কোন দলের, শতরঞ্জ কী আনাড়ি না খিলাড়ি? থমকে যাওয়ার কিছু নেই। এই দুটো বিশেষ্যই তো আমাদের আসল পরিচয়। একবার চেয়ে দেখুন চারিপাশে। বিশাল একটা দাবার ছকে দিন রাত আমরা যেন রাজা, রানী, মন্ত্রী, গজ, বোড়ে – এক ঘর থেকে আরেক ঘরে গিয়ে বসছি – কেউ ছলে, কেউ কৌশলে, কেউবা স্রেফ বুদ্ধির জোরে টপাটপ বাধা কাটিয়ে, প্রতিপক্ষের রাজাকে ধরাশায়ী করে কিস্তিমাত করছে – শুরু হচ্ছে তার নতুন ছকে নতুন প্রতিপক্ষের সাথে নতুন খেলা। আর কেউ একই ছকে, একই খেলায় বারবার হেরে, ঘুরে মরছে গোলকধাঁধায়।

আমি কেন আনাড়ি? আসলে জনসমক্ষে বুক চিতিয়ে নিজেকে উঁচু দরের খেলোয়ার জাহির করতে বেশ ভয় করে। আশেপাশে আজকাল জ্ঞানীগুণী মানুষের ভীড় ভারি। সবাই কত কিছু নিয়ে চর্চা করে, লেখালেখি গান বাজনা ফটোগ্রাফি এমনকি রান্নাবান্নাও – সবাই সর্বজ্ঞ – তর্ক বিতর্ক চলে কত রকম, চায়ের পেয়ালায় তুফান তুলে তারা আরামকেদারা থেকে পৃথিবীর নানা কোণায় বিপ্লব নিয়ন্ত্রন করে। ধরুন তাদেরই মধ্যে থেকে কেউ খপ করে ধরে যদি জিজ্ঞেস করে “৬৪-র ঘরের নামতাটা বলুন দেখি, তাহলে বুঝব আপনি পাকা খেলোয়ার”। অথবা ধরুন গান শুনছি, তারই মাঝে কেউ ব্যাঘাত ঘটিয়ে বসল, “এই যে হিগস বসন নিয়ে এতো গবেষণা, সেই গড পার্টিকেল-এর হদিস পেলে কি মানুষ শেষমেষ ভগবানের দেখা পাবে?” আর এই সেদিন কি তুফান, ‘মাসলোর মানুষের চাহিদার শ্রেণীবিন্যাসের পিরামিড-এর নীচে, সব থেকে নীচু শ্রেণীর যে মানুষগুলো পিষ্ট হয়ে আছে, তারা যদি হঠাৎ সমাজের সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে উঠতে আরম্ভ করে তাহলে কি আসন্ন প্রজন্মেরা “চাকর” কথার মানে জানতে অভিধান খুলে বসবে?’ বা কেউ যদি চেয়ে বসে মতামত – “এন্ড্রয়েড না আই ফোন?” “ফেসবুক না টুইটার?” “ম্যান ইউ না আরসেনাল?” “কুরোসাওয়া না বার্গম্যান?” “অরহান পামুক নাকি গেব্রিয়েল মার্কেজ?”

বাতাসে বুদবুদের মত অনেক কথা, নানা তথ্য, নতুন মতবাদ আরো কত কি ভেসে বেড়াচ্ছে – কতটুকুই বা আমার নাগালের মধ্যে? ধরতে গেলে, আঙ্গুলের ছোঁয়া লেগে হাওয়ায় মিশে যায় হাওয়া হয়ে। তাই পাকা খেলোয়ার হয়ে উঠতে পারলাম না এখনো।

আমি হতে চাই একটু দলছুট। জ্ঞানীগুণীদের ভিড় এড়িয়ে, নির্নিমেষে বয়ে চলা ঐ জ্ঞানের স্রোত থেকে গা বাঁচিয়ে, পাড়ে বসে পা দোলাব, বিনি পয়সার বায়োস্কোপে দিবাস্বপ্ন দেখব। আমি আনাড়িই ভালো। বাঁধা ছকের ওপর রাজা ক’পা পিছোবে, গজ কাকে আগলাবে, রানী বাঁচাতে ক’টা বোড়ের সর্বনাশ ডেকে আনব – ওই হিসাবটা ঠিক এখনও কষে উঠতে পারিনা।

তার চেয়ে এদিক ওদিক হাঁটকে, এখানে ওখানে কান পেতে – নানা কথার পিঠে কথা গেঁথে, গল্প সাজিয়ে, আসর পেতে আড্ডা মারব, কেমন? প্যাঁচপয়জার, তর্ক বিতর্ক, জ্ঞানগম্যির নাগালের বাইরে – শতরঞ্জ কী আনাড়ির আড্ডা।

 

পলাশ

পলাশ ফুল ফুটতে দেখেছ? সারা শীতভর পাতা খসানো কঙ্কালসার গাছটা ধূসর আকাশের পানে শুকনো ডালগুলো মেলে যখন দাঁড়িয়ে থাকে, কোন’দিন ভেবেছ উষ্ণতার একটু পরশ পেলেই কি করে তার হৃদয় চিড়ে পলাশের পাপড়িগুলো রক্তবিন্দুর মত ফুটে ওঠে?

সেই কত বছর আগেকার কথা, কলেজে যাওয়ার রাস্তায় যখন বাসটা ময়দানের গা ঘেঁষে পার্ক স্টিটের দিকে একটু হেলে পড়ে মোড় ঘুরত, আমি জানালার পাশে সিটটায় বসে হাঁ করে ময়দানের পলাশ গাছটাকে দেখতাম। ইঁট, কাঠ, পাথরের ধূসর এই শহরটায় বসন্তই বা কি আর কীই বা শরত? হেমন্তের আশা তো করাই দুরাশা। তবুও ধুলো ওড়া, ন্যাড়া মাঠটার ধারে রিক্ত, রক্তাক্ত গাছটাকে দেখে মনে কেমন যেন দোলা লাগত। হয়তো বয়সটাই তখন অমন ছিল, অথবা মোটা, মোটা রোমান্টিক নভেল পড়ে, শীল্পির কল্পনায় আঁকা পলাশের রঙে মেতে, বসন্ত রাঙ্গানো পলাশের ওপর কবিদের লম্বা লম্বা দীর্ঘশ্বাস শুনে বুঝি আমিও পলাশ নিয়ে একটু বেশীই ভাবিত হয়ে উঠেছিলাম। যাই হোক, কলেজ জীবনের ঐ তিনটে বছর আমার মনের একতা কোণা রাঙ্গিয়ে, মাতিয়ে রেখেছিল ময়দানের সেই পলাশ।

তারপরের বছরগুলো কোথা দিয়ে যে কেটে গেলো তার হিসাব মেলাতে বসলে সব কিছু আরও বেহিসাবি মনে হয়। তাই তার হিসেব মেলাতে আর চেষ্টা করি না।

বেহিসাবি এই মনকে নিয়ে সেদিন বেড়িয়ে ছিলাম দাহানুর পথে বোর্দি বীচ যাব বলে। বোম্বের শীত তখন পালাই পালাই করছে, হাওয়ায় নরম রোদের ঊষ্ণ পরশ। শহরটাকে পিছনে ফেলে লম্বা সর্পিল হাইওয়ে ধরে গাড়ি ছুটছে, মাজে মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ে ঠিকানা খুঁজছে, ভুলভাল অলি গলিতে ঢুকেও পড়ছে। এই রকমই একটা ভুল গলির মুখে থমকে থেমে দিক ঠিক করার চেষ্টায় ব্যাস্ত সবাই। এমন সময় চোখে পড়ল গলির বাঁকে চেনা মুখ, চেনা হাসি, চেনা সেই রঙ – নিবিড় নীল আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা পলাশ গাছ – ডালগুলো থেকে ফেটে পড়ছে আগুনরঙ্গা ফুল, মাটিতে লুটিয়ে আছে শুকনো পলাশের গালিচা।

বলব কি? অনেকদিন পর প্রিয়জনের সাথে দেখা, ইচ্ছে হল বুকে জড়িয়ে ধরি।

‘সেটা একটু বেশী বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে না?’ বলে বসল মন। অতএব, বাধ্য হয়ে ইচ্ছের ডানাটি ভাঁজে ভাঁজে মুড়ে তুলে রাখলাম আবার মনের কোণায়। ‘দেখা তো পেলাম আবার,’ মনে মনে হাসলাম।

আরো মজা কি জানো? সেদিন সারা পথ রাস্তার দুই ধারে অনেকগুলো পলাশ গাছ চোখে পড়ল, কয়েকটাকে ক্যামেরা-বন্দি করে বাড়িও নিয়ে এলাম। আর বিকেলে, বাড়ি ফেরার পথে ঢলে পড়া রোদের নরম আলোয় দেখলাম এই শহরটার আনাচে কানাচে, রাস্তার কোণায়, বাড়িগুলোর আড়ালে, বড় বড় হোর্ডিংগুলোর পিছনে বেশ ক’টা পলাশগাছ লুকিয়ে আছে। এতদিন নজরেই পড়েনি বা হয়তো ব্যাস্ততার মাঝে চোখ তুলে খুঁজিওনি আমি।

আরোও আশ্চর্য হলাম গতকাল। তিনটে নাগাদ গনগনে রোদে মেয়েকে স্কুল থেকে নিয়ে বেড়িয়েছি। কাল মতলব ছিল মেয়ের সাথে গল্প করতে করতে একটু লম্বা রাস্তা ধরে হেঁটে ফিরব। তাই স্কুলের পিছনের গেট দিয়ে বেরিয়ে রাস্তার উল্টোদিকে, মাঠের গায়ের ফুটপাথটা দেখে আমি থ। মাঠের ঘাসে, ফুটপাথ জুড়ে সদ্য ঝরা পলাশের মেলা।

p2

 
১ টি মন্তব্য

Posted by চালু করুন মার্চ 25, 2013 in বিভাগবিহীন

 

পয়লা বোশেখ

কালকের পয়লা বৈশাখ অতীতের কিছু পয়লা বৈশাখের স্মৃতি হঠাৎ তাজা করে রেখে গেছে। আজ দোসরা বৈশাখ, ১৪১৯, রবিবার। সকাল থেকে মন সেই স্মৃতি চারণে মশগুল। ব্লগের পাতায় তুলে দিলাম তারই কিছু মুহূর্ত।

চৈত্র মাসের শেষ দিনটা আমি ছোটবেলায় কোনদিন বাড়িতে কাটিয়েছি বলে তো মনে পড়ে না। সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেই ছুটির ঘণ্টা বাজার তর সইত না। বেল বাজলেই সব্বার আগে ক্লাস ছেড়ে দৌড়।

মামারবাড়ির পাড়ায় স্কুল হওয়ার এটাই মজা। কোনো না কোন ছুতোতে বা বিনা কারণেই রোজ একবার করে ঢুঁ মারা যায়। তবে চৈত্রের শেষ দিনে, মুচিপাড়া থানার গোলাপ শাস্ত্রী লেনের লম্বা রকওয়ালা দোতলা বাড়িটার প্রতি টানটা একটু বেশিই হত। সদর পেরিয়ে, একতলার বৈঠকখানার স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকারটা চট করে পিছনে ফেলে উঠে এক দৌড়ে উঠে যেতাম দোতলায়। সেদিন আর ভাত খেয়ে ঘুম পেত না, বিকেলে ছাদটাও ডাকত না, জানালার নিচে আইসক্রিমওয়ালা হেঁকে গেলেও কানে যেত না, লেবুতলা পার্কের আলুকাবলিওয়ালাটাকেও সেদিন মনে পড়ত না।

মামারবাড়ির দোতলার খাবার ঘরে তখন ঘটনার ঘনঘটা। এক কোণে সুতোর রিল, শোলার কদমফুল, আমপাতা আর এক ঝুড়ি গাঁদাফুলের মালা। টেবিলের ওপর দিদার হাতে রাঁধা নারকেল দেওয়া ভাজা মুগের ডাল, কচি পটল ভাজা, ভেটকি মাছের কাঁটা দিয়ে ছ্যাঁচড়া, চিংড়ি মাছের মালাইকারি ইত্যাদি। মান্ধাতার আমলের ফ্রিজটার পাশে বড় বড় চাঙ্গাড়ি – হলুদ সেলোফেনে ঢেকে, গোলাপি সুতো দিয়ে বাঁধা। পাশে একতাড়া কাগজের খোলা বাক্স।

পেটপুজো শেষে শুরু হত দক্ষযজ্ঞ।

আচ্ছা, মিষ্টির দোকান থেকে মিষ্টি ভরা যে বাক্সগুলো আসে, তার রহস্য জান কি? ভাঁজে ভাঁজে মুড়ে, খাজে খাঁজ মিলিয়ে, খাপে খাপে বসিয়ে মিষ্টির বাক্স বানিয়েছ কোনদিন? ঠিক অরিগামির হাঁস, বক বা ফুল বানানর মত, তাই না? আমাদের কাজ শুরু হত ওই বাক্স বানান দিয়ে। নজর যদিও বাক্সের উপর থেকে সরে, বারে বারে চলে যেত ঘরের কোণে রাখা চ্যাঙ্গারীগুলোর দিকে – যার হলুদ সেলফেনের নিচে গা ঢাকা দিয়ে আছে ভীম নাগ ময়রার দরবেশ – জাফরানি আর লালচে নরম বোঁদের নাড়ু, উপরে শুকনো ক্ষীরের পরত – মন কি আর শূন্য বাক্সে বেশিক্ষণ বসে? বাক্স তৈরির শেষে, দিদা হাতে ধরাত আমপাতা আর শোলার কদমফুলের তোরণের কাজ। তা শেষ করতে পারলেই দরবেশ চাখার সুযোগ। আর বিকেলে চায়ের সাথে রামপদ রায়ের সিঙ্গারা। রাতে দিদার হাতে পরটা না হলে পেটই ভরত না। আর তারপর রাতভর ভোরের অপেক্ষা। টাটকা গাঁদাফুলের মালাগুলোও অজগরের মত প’ড়ে থাকত ঝুড়িতে, কাল সকালের অপেক্ষায়।

পরদিন কাকভোর থেকেই সরগরম একতলার বৈঠকখানা। হাওড়া হাট থেকে আসত আরও বাহারি ফুল, মিষ্টির দোকান থেকে ক্যানেস্তারা ভরে আসত টাটকা, গরম, খাস্তা নিমকি, চাঙ্গাড়ি ভরা ভীম নাগের “শুভ নববর্ষ” সন্দেশ, গরমাগরম সিঙ্গারার ঝুড়ি – ঘেমো মুটেগুলো যে যার ক্যানেস্তারা, চ্যাঙ্গারী নামিয়ে নানা সুরে”নয়া সাল”এর বকশিসের আবদারে জুটে যেত।

এতো তোড়জোড় কিসের? কেন, পয়লা বোশেখে দাদুর দোকানের হাল খাতার পুজোর জন্য। ফিরিঙ্গি কালীবাড়ির পাড়ায় সেদিন বিশাল দোকানটায় টেবিল চেয়ার সরিয়ে, ঝাড়পোঁছ করে, ধুয়েমুছে, এক কলি চুনকাম চড়িয়ে, নতুন শতরঞ্চি পেতে সাজানো। সামশেরদাদা দেওয়ালে মালা সাজাতে, কাশেমদাদা দরজার মাথায় কদমফুল আর আমপাতার তোরণ লাগাতে আর এক কোণে মামারবাড়ির পুরোহিত আসন পেতে পুজোর আয়োজনে ব্যাস্ত। লাল হালখাতার প্রথম পাতায় সিঁদুর মাখা রুপার টাকার ছাপ পড়ত, চুনকাম করা দেওয়ালে নতুন করে আঁকা হত তেল সিঁদুরের সিদ্ধিদাতার স্বস্তিকা। ধুপ ধুনোয় ভরে যেত ঘর। আর তারপর সারা সকাল বৌবাজার পাড়ার লোকজনেদের মিষ্টির বাক্স বিলানো।

আমার স্মৃতিজড়িয়ে আছে সেই কদমের তোরণে, মন প’ড়ে আছে তাজা চুনকাম করা দেওয়ালের কুলুঙ্গিতে, নতুন পাওয়া জামাগুলোর সরল আনন্দে, রাতে দিদার হাতে লুচি মাংসে আর প্রতি পয়লা বৈশাখের হালখাতার প্রথম পাতায়।

picture courtesy : inmagine.com

 
১ টি মন্তব্য

Posted by চালু করুন এপ্রিল 15, 2012 in বিভাগবিহীন

 

একুশে আইন – revisited

শিব ঠাকুরের আপন দেশে,

আইন কানুন সর্বনেশে!

কেউ যদি যায় পিছলে প’ড়ে,

পেয়াদা এসে পাকড়ে ধরে —

কাজির কাছে হয়ে বিচার,

 একুশ টাকা দণ্ড তার ।।


সেথায় সন্ধে ছ’টার আগে

হাঁচতে গেলে টিকিট লাগে —

হাঁচলে পরে বিন টিকিটে —

দম দমা দম লাগায় পিঠে,

কোটাল এসে নস্যি ঝাড়ে —

একুশ দফা হাঁচিয়ে মারে ।।

কারুর যদি দাঁতটি নড়ে,

চারটি টাকা মাশুল ধরে,

কারুর যদি গোঁফ গজায়,

একশো আনা ট্যাকশো চায় —

খুঁচিয়ে পিঠে গুঁজিয়ে ঘাড়, 

সেলাম ঠোকায় একুশ বার ।।


চলতে গিয়ে কেউ যদি চায়,

এদিক, ওদিক, ডাইনে, বাঁয়ে,

রাজার কাছে খবর ছোটে,

পল্টনেরা লাফিয়ে ওঠে,

দুপুর রোদে ঘামিয়ে তায়,

একুশ হাতা জল গেলায় ।।


যে সব লোকে পদ্য লেখে,

তাদের ধ’রে খাঁচায় রেখে, 

কানের কাছে নানান সুরে,

নামতা শোনায় একশো উড়ে —

সামনে রেখে মুদির খাতা–

হিসেব কষায় একুশ পাতা


হঠাৎ সেথায় রাত দুপুরে,

নাক ডাকালে ঘুমের ঘোরে,

অমনি তেড়ে মাথায় ঘষে,

গোবর গুলে বেলের কষে,

একশোটি পাক ঘুরিয়ে তাকে

একশো ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখে।।

 

একা এবং সোশাল-নেটওয়ার্ক

একটা লেখার ঝোঁকে অনেকক্ষণ জেগে আছি আজ, কখন যে মাঝরাত গড়িয়ে গেছে হুঁশও হয়নি। বাকি সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন, সারা বাড়ি নিঝুম। জানালার বাইরে মধ্যরাতের শহরটা রাতের আকাশের মত  অন্ধকার, আশপাশের বাড়িগুলো অন্ধকারের ঘোমটা টেনে ঘুমিয়ে পড়েছে, জেগে আছে শুধু রাস্তার দুধারের নিওন বাতিগুলো। নীচে রাস্তায় কমে গেছে গাড়ির ভিড়, সেই সুযোগে নেড়ির দল সরু গলি ছেড়ে বড় রাস্তা দখল করতে নেমেছে, তাদের চিৎকার মাঝে মাঝে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে রাতের নীরবতাকে। আর শুধু একটা দুটো দলছুট অটোরিকশা রাতের সওয়ারির খোঁজে এখনও রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে।

ঘরের আধো অন্ধকারে আমার নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্যে টেলিভিশনটা মিউট করে চালানো। এদিকে  মগজের অবস্থা “খাচ্ছে, কিন্তু গিলছে না” – লেখাটা এক জায়গায় এসে থেমে গেছে – মনও আর বশে নেই, সেও উড়ি উড়ি, এই সময়ে আর লেখায় বসবে না।

আমি কম্পিউটারের ওয়ার্ড ডকুমেন্টটা বন্ধ করে ইন্টারনেটের ব্রাউসারটা খুললাম। অভ্যাসবশত ফেসবুক আর টুইটারে লগ ইন করে চোখ গেল স্ক্রিনের কোনায় ঘড়ির দিকে – রাত দুটো! কিন্তু ল্যাপটপের এল সি ডি স্ক্রিনের ওপারে দেখি এখনও বয়ে চলেছে এক সমুদ্র নিস্তব্ধ কথার স্রোত। পূর্ব গোলার্ধের বেশিরভাগ মানুষই যখন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছে, কিছু নিশাচর তখনও জেগে। তবে শুধু জেগে থেকে ক্ষান্ত নয় তারা, পুরদস্তুর আড্ডার আসর চালিয়ে যাচ্ছে নিজেদের মধ্যে, কেউ আড়ি পাতছে অন্যের কথায়, কেউ বা ঝগড়ায় ব্যস্ত, কেউ ব্যস্ত নিজের কবিতা পড়তে, একজন ব্যস্ত নিজের সাম্প্রতিক ফরেন ট্রিপের অ্যালবাম ফেসবুকে লাগাতে, তো অন্যজন ব্যস্ত অচেনা ফেসবুক বন্ধুর জীবনের ঘনঘটা ভরা অ্যালবাম থেকে তাকে একটু চিনতে। টুইটারে বয়ে চলেছে তর্ক-বিতর্কের ঝড়, রাতজাগা এক সুন্দরীর ব্যর্থ প্রেমের প্রলাপ, বিশিষ্ঠ এক ফিল্মস্টারের ফিলসফি ক্লাস, সিনেমার সমালোচনা, রাজনিতি, কূটনীতি, রান্নাবান্না, লেখকের স্মৃতিচারণ, স্কচ, রাম, জিনের ফোয়ারাও। আজ মাঝরাতে জেগে থেকে এক নতুন জগতের হদিস পেলাম।

মন শুধালো, ‘আচ্ছা, এদের পাশের মানুষগুলো কি নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে, নাকি এরা সবাই একা, অবিবাহিত, পিজিতে  বা হস্টেলে থাকা কম বয়সী ছেলে মেয়ে? ঘর ছেড়ে দূর শহরে চাকরি করে বুঝি? এদের ঘর বাড়ি নেই, সংসার নাই, কাল সকালে উঠে অফিস যেতে হবে না, ছেলে মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে হবে না? এত রাতে এরা জেগে আছে কেন? এদের ঘুম পায় না বুঝি, ইনসমনিয়াক?’ বাতুল মনকে দেবার মনের মত কোন উত্তর খুঁজে পেলাম না।

আধুনিক নগর-সভ্যতার অভিশাপ আর জরা-ব্যাধি-মড়ক নয়, তার চেয়েও ভয়ঙ্কর, অদৃশ্য এক শত্রু, একাকীত্ব। নিঃসীম সমুদ্রে ভেসে বেড়ান দ্বীপ আমরা। দিনভর কেরিয়ারের দাসত্ব, ই এম আই, স্কুল ফি, গাড়ির লোন, সংসারের নানা মাথাব্যাথা। ফুরসৎ কথাটা বাংলা-ঈংলিশ মোটা ডিকশনারির পাতার মাঝে হারিয়ে গেছে। বন্ধু আছে, কিন্তু সময় নেই। আবার কখনো সময় থাকলেও মনের মত বন্ধু থাকে না। বন্ধু থাকে তো মনের মানুষ পাওয়া যায় না। যেন আমরা প্রতি পল আরও একটু বেশি নিঃসঙ্গ, আরও একা হয়ে পড়ছি।  মানুষের একাকীত্বের কি কারণ? নানা মুনির নানা মত। এই একটা অসুখ আমাদের প্রতি নিয়ত গ্রাস করে চলেছে, কিন্তু তার কোন ওষুধ খুঁজে পাওয়া যায়নি এখনও।

আজ মাঝরাতে ব্রাউসারের পাতায় পাতায়, ফেসবুকের আপডেটে, টুইটারের টাইমলাইনে, অর্কুট, মাই স্পেস, গুগুল প্লাস, পিন্টারেস্ট- এর মত “সোশাল নেটওয়ার্ক”এর দেয়ালে দেয়ালে দেখলাম নিদ্রাহীন, স্বপ্নহীন এক জনস্রোত – নানা জন, প্রচুর কথা, হাজার প্রশ্ন, মান-অভিমান, ভাব, ভালবাসা, হিংসা, ঝগড়া – ঠাণ্ডা স্রোতের মত নীরবে বয়ে চলেছে ঠাণ্ডা কাঁচটার ওপারে – একাকীত্বের নিঃশব্দ কোলাহল। সে জগতে কেউ ঘুমোয় না, কেউ স্বপ্নও দেখে না। এত কথার, এত আওয়াজের মাঝে শুধু একটা কথাই শুধু সবাই নিঃশব্দে চিৎকার করে বলে চলেছে, “আমি একা, আমি একা, আমি একা”।

তাহলে নাগরিক একাকীত্বের একমাত্র ওষুধ কি এই ছায়ার মায়া জগৎ, এই ‘সোশাল নেটওয়ার্ক’ ? ছায়া মানবের সাথে ছায়া মানবীর কথোপকথন, বন্ধুত্ব, প্রেম, অনুরাগ, বিরাগ? যেন এক অদৃশ্য তরঙ্গ বয়ে চলেছে মহাদেশ থেকে মহাদেশে, ছুঁয়ে চলেছে জীবন থেকে জীবনে, বন্ধুত্ব গড়ছে, দ্বীপের মত ভেসে বেড়ান মানুষগুলোর মাঝে গড়ে উঠছে সেতু। এদের মধ্যে এমন অনেকেই আছে যারা মনে করে যে এই ছায়া সরণির পথে পাওয়া বন্ধু রক্ত মাংসের মানুষের চেয়ে অনেক ভালো, দুঃখ দেবে না, ঠকাবে না, বন্ধুত্বের পরিবর্তে হয়তো প্রতিদানও চাইবে না। এমনই ভালো। ‘লগ ইন’ করে হাত বাড়ালেই বন্ধু আর ‘লগ আউট’ করে কম্প্যুটার অফ করলেই সব দায়বদ্ধতা শেষ।

কিন্তু এই জগত কি ওষুধ, নাকি অসুখ? যে একাকীত্ব কাটানোর জন্য এই একা মানুষগুলো দিনরাত এক করে ঐ মায়াজালে জড়িয়ে আছে, সেই একাকীত্ব কি কাটছে? নাকি বেড়ে চলেছে মানুষে মানুষে ব্যাবধান? ছায়া বন্ধুর টানে কি ভুলে যাচ্ছে না সে আসল বন্ধুকে? সে কি আরও একা হয়ে পড়ছে না?

 
5 টি মন্তব্য

Posted by চালু করুন এপ্রিল 10, 2012 in বিভাগবিহীন

 
 
%d bloggers like this: