RSS

নীরা-রা

12 নভে.

আমার এই সময়ের ব্লগ শতরঞ্জ কি আনাড়ির পাতা থেকে তুলে দিলাম এই ছোট গল্পটি

নীরা অনেকক্ষণ ধরে গালে হাত দিয়ে রাস্তার ধারে বারান্দাটায় দাঁড়িয়ে আছে। বিকেলের পড়ে আসা নরম আলোয় সামনের সরু একফালি পার্কটার গাছগুলো আকাশের গায়ে নকশার মত দেখাচ্ছে, তাই দেখছিল এক মনে। সদ্য বিগত শীতের হিমেল ছোঁয়া বেলা শেষে কেমন যেন ঠান্ডা ছ্যাঁকা দিচ্ছে গায়ে। পাতলা খদ্দরের চাদরটা আরেকটু গায়ে টেনে নিল নীরা। পার্কটার একদিকে লাল দোলনাগুলোয় এ পাড়ার যত ক্ষুদে মাথাদের ভিড়, দলাদলি, গলাগলি চলেছে পুরো দমে। তাদের সাথে আসা কয়েকজন বৃদ্ধ বসে আছেন একটু দূরে, পাঁচিলের গা ঘেঁষা লোহার বেঞ্চিগুলোয়। নীরা খানিক বোঝার চেষ্টা করল কী কথা চলেছে তাদের মধ্যে। হয়তো বার্দ্ধ্যকের অভিশাপ লাগা জীবনের দায়বদ্ধতার হিসাব নিকাশ করছেন, কে জানে? হঠাৎ স্ট্রোকে মারা যাবার কিছুদিন আগে অবধি ওর ঠাকুর্দা যেমন ওর হাত ধরে পার্কে নিয়ে গিয়ে ওকে ওর বন্ধুদের কাছে ছেড়ে দিয়ে ‘এই বয়সে কি আর ক’মাস বড়ছেলের বাড়ি আর ক’মাস ছোটছেলের বাড়ি – এই চক্কর কাটা চলে…’ এই আলোচনায় মশগুল হয়ে পড়তেন। গেটের পাশে শৌখিন পাতলা উলের চাদর গায়ে দুই বিগত যৌবনা ঠাকুমা রেলিং-এ হেলান দিয়ে সংসারের প্যাঁচ কষে চলেছেন। বাকী যারা, তাদের মধ্যে চলেছে ‘সাহেব আর ম্যাডামের’ পিন্ডি চটকানো। সারাদিন ‘ডাবল ইনকাম’ ফ্যামিলির ঝি হয়ে সংসারের গিন্নীপনা করা আর বিকেলে এসে সেই বাড়ির সব রসালো গল্প হাটে চাউর করা।

ওদের এই পাড়াটা বড় রাস্তার বাজারটা পেরিয়ে ডানদিকে মোড় ঘুরলেই প্রথম গলি – কিন্তু বড় রাস্তার হৈ হট্টগোল কিছুই টের পাওয়া যায় না। অটো স্ট্যান্ডটা আর ফুলের দোকানটা পেরিয়েই বাঁদিকে গলির ফটকে ঢুকে পড়লেই মনে হয় অন্য জগত। তার ওপর নীরারা যে বাড়িটায় ভাড়া থাকে, সেটা ওদের গলির প্রায় শেষ মাথায় – আর বেশ সুন্দর দেখতে – দুধারে দুই সারি বাড়ি আর মাঝে এক ফালি পার্ক।

বিয়ের কয়েক মাস বাদেই গোটা আষ্টেক কার্টন, পাঁচটা স্যুটকেস আর দুটো গোদা স্ট্রোলি নিয়ে এসে নেমেছিল কলকাতা রাজধানি থেকে, দিল্লির কাশ্মীরি গেটে। সাথে মাত্র কয়েক মাস পুরানো স্বামী রাতুল। সংসারটিও বেশ পাকা গিন্নীর মতই গুছিয়ে ফেলেছিল ক’সপ্তাহের মধ্যেই। আর গত ছ’মাসে বেশ কটা বন্ধু পাতানোও হয়ে গেছে, কাবেরী, সুদীপা, তমগ্না, সিমরন। ভালোই আছে নীরা। ‘এখন অপেক্ষা কবে এ পাড়ার স্কুল থেকে আমার ইন্তারভিউ কলটা আসে’ মাকে কাল রাতে নীরা বলেছিল ফোনে, ‘দিল্লী এসে তো ছ’মাস হাত গুটিয়ে বসেই আছি।’

স্কুলের চাকরিটা ইচ্ছে করেই নেবে ঠিক করেছে নীরা। কলকাতায় বেশ কয়েক বছর বিজ্ঞাপনের রকমারি মারপ্যাঁচ নিয়ে লড়ে এসেছে একটা অ্যাড এজেন্সিতে, ফর্সা হওয়ার ক্রীম বেচতে আর ভালো লাগে না। ভেবে একটু হাল্কা একটা হাসি খেলে গেল ওর ঠোঁটে।  ক্রীম, সাবান, তেল আর পটাটো চিপস বেচার জন্য কত রকম মিথ্যাই না সাজিয়ে গুজিয়ে রঙ চড়িয়ে বলতে হয়েছে। কলকাতায় তো আবার আরও মজা – বোম্বে থেকে তারকা খচিত বিজ্ঞাপন তৈরি হয় আসত হিন্দিতে, সেগুলোকে শুধু বাংলায় ডাবিং করে চালিয়ে দাও।

সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিল নীরা, হিমেল হাওয়ায় মুক্তির গন্ধ। ও এখন মন দিয়ে রাতুলের সংসার করতে চায় – আর কিচ্ছু না। তাই এ পাড়ার কালিমন্দিরের পাশে বেশ নাম করা একটা স্কুলে ইংলিশ টিচারের চাকরি খালি আছে শুনে গত সপ্তাহে নিজের বায়োডেটা দিয়ে এসেছে। ভালই মাইনে, অনেক ছুটি আর সকাল আটটা থেকে বেলা তিনটে অবধি স্কুল – আর কি চাই? রেলিংটার গা থেকে সরে এসে বারান্দায় রাখা বেতের চেয়ারটায় বসল। টেবিলে উল্টে রাখা বইটা তুলে একটু নাড়াচাড়া করল। বাইরের জানালা দিয়ে টিভির ওপর ওর আর রাতুলের গোয়ায় হানিমুনের ছবিটায় চোখ গেল। রাতুল মিত্র, দিল্লীর নামকরা একটি পি আর এজেন্সীর ভাইস প্রেসিডেন্ট, একটু বেশী মাত্রায় কাজপাগলা – তাই তিন বছরেই এই সংস্থার হিসাবের খাতায় দিন রাত এক করে লাভের অঙ্কে আরও গোটা তিনেক শূণ্য যোগ করেছে আর তরতর করে উপরে উঠে চলেছে। জীবনে একটাই কথা মানে সে ‘দ্য স্কাই ইজ দ্য লিমিট’।

বইটা নামিয়ে রেখে আবার রেলিং-এর ধারেই হেলান দিয়ে দাঁড়ালো নীরা – মাঠের আলোগুলো জ্বালিয়ে দিয়েছে – ঝুপ করে অন্ধকার নেমেছে, তাই মাঠের কোণে কোণে ঘুপচি অন্ধকার।

রাতুলটা কাজ পাগল ঠিকই, কিন্তু বাড়িতে দিনে সে অন্য মানুষ – গান পাগল, বই পাগল, ঘুম কাতুড়ে আর পেটুক। ‘আমার একটাই দোষ, মিথ্যা কথা সহ্য করতে পারি না – অ্যান্ড আই হেট লায়ারস’ প্রায়ই বলে রাতুল। যেন সাবধান করে দেয় নীরাকে। ‘বাট আই লাভ ইউ’ বলেই জড়িয়ে ধরে ওকে। ওর আদরে নিরা অনেক কিছু ভুলতে শিখেছে।

মাঠের গেটে চোখ গেল। ওপরের ফ্ল্যাটের কাবেরীর বর, সমর না? ও আর একটু ঠাহর করে দেখার চেষ্টা করল। কাবেরী তো ছেলেদের নিয়ে বাপেরবাড়ি গেছে, লাখনৌ-এ, ওর বাবার বাৎসরিক। সমরের সাথে ওই বাচ্চা মেয়েটা কে? গলির মুখের বাড়িতে থাকে সুদীপা, ওর মেয়ে বুলবুলির মত লাগল দেখতে। কিন্তু বুলবুলির সাথে তো সুদীপার কাজের মেয়েটা এসেছিল, ও তো ঘন্টা খানেক আগেই বারান্দা থেকে দেখেছে। তবে এখানে এসব খুব আছে, ছেলেমেয়েদের ওপর মা বাবাদের টানটা কেমন ছাড়া ছাড়া – নিজেদের নিয়ে এতই সবাই ব্যাস্ত যে ছেলেমেয়ে বড় হয় ঝি চাকরের হাতে।

কিন্তু নীরার বুকটা কেমন করে উঠল। বুলবুলির হাত ধরে সমর তখন পার্কের গেটের বাইরে বেড়িয়ে গেছে, ওদিকটা একটু দূরে বলে কেমন আবছায়া। আবার সেই গা সিরসির করা, ঘিনঘিনে ভাবটা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে, কান, গলা, কাঁধ গড়িয়ে বুকের পাঁজরের ওপরে যেন চেপে বসছে – পাকিয়ে পাকিয়ে নাভিমূল থেকে পায়ের পাতার দিকে নেমে যাচ্ছে। আবার সেই অন্ধকারটা চেপে বসছে মাথার ভিতর – নীরা জানে, এর পরে ওর খুব শীত করবে আর তারপর কুলকুল করে ঘাম বইবে। 

‘ব্রতিদা আর না, ব্যাথা লাগে … আর না … উহ! না! না!’ ও জানে রাতুল ওকে ভালোবাসে, কত ভালোবাসতে চায়। ও নিজেও তো রাতুলকে আঁকড়ে ধরে সব ভুলতে চায়। ব্রতিদা, কলকাতার পুরানো পাড়া, সেই দুপুরগুলো। ‘আহ, আহ… ব্রতিদা… লাগে, বড্ড লাগে…’ ******************************

কলিং বেলটা বেজে উঠল, নীরা চমকে উঠল। এই ভর দুপুরে কে এলো? 

সুতির ওড়নাটা গায়ে টেনে দরজার দিকে এগিয়ে গেল, এক নজরে ঘড়িতে দেখল বেলা সাড়ে তিনটে। ইস্তিরিওয়ালাটা তো আসবে আরো একটু পরে, তবু বলা যায় না, আজ হয়তো আগে এসেছে। কাল রামসুখ রাতুলের বাড়িতে পড়ার একটা টি শার্টের কলারটা পুড়িয়েছে, তাকে বকতে উদ্যত হয়ে দরজাটা খুলে থমকে গেল। হাতে একটা কাপড়ের ন্যাপকিন ঢাকা প্লেট আর সেই প্লেটের মালকিন কাবেরী একগাল হেসে ওকে ইচ্ছে করে একটু ধাক্কা মেরে ওর পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকল।

‘বাব্বা, অমন রাগী মুখ নিয়ে কার জন্য দরজা খুলছিলি? রাতুলের তো ফিরতে এখনও অনেক দেরী?’ ঠাট্টার সুরে কথাটা ছুঁড়ে দিয়ে সোফায় গিয়ে গা ঢেলে দিল কাবেরি।

‘আরে, সে রকম কিচ্ছু নয়! রামসুখ কাল রাতুলের একটা বাড়িতে পরার টিশার্টের কলার পুড়িয়েছে, কিন্তু সেটি তার অতিপ্রিয়, অস্ট্রেলিয়া থেকে বোধহয় তিন বছর আগে এনেছিল, পরে পরে রঙ জ্বলে ভুত হয়ে গেছে, এখনও মায়া ত্যাগ করতে পারেনি!’

‘ভালো রে, পুরানো জামা ফেলে দিতে যার এতো কষ্ট, সে তার নতুন বউকে কত ভালবাসে বল তো? এই রকম ছোট ছোট কথা দিয়েই তো মানুষ চেনা যায়। দেখিস না আমার বরকে, মা বলতে অজ্ঞান, তাই ছেলেদের মাকেও ফেলতে পারে না।’ কাবেরি হেসে প্লেটের থেকে ন্যাপকিনটা সরিয়ে, ওর দিকে বাড়িয়ে দিল। ‘লখনৌ থেকে তো কিছু আনিনি তোর জন্য, আজ বিল্টু আর বুবুর জন্য ব্রেড রোল বানিয়েছি, তাই তোর জন্য নিয়ে এলাম।’

নীরার এই সাবলীল সোজা মানুষটাকে বেশ ভালো লাগে। এই বাড়িরই তিনতলায় স্বামী সমর চৌধুরি, দুই ছেলে বিল্টু আর বুবু আর একটা জার্মান শেপার্ড, ঝুপুকে নিয়ে সুখী সংসার। গত মাস খানেক কাবেরী ছিল না বলে তিনতলাটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগত – শুধু মাঝে মাঝে সন্ধ্যার মুখে অদ্ভুত গোঙানির আওয়াজটা – কথাটা মনে হতেই কাবেরিকে সোফায় ছেড়ে নীরা তাড়াতাড়ি রান্নাঘরের দিকে হাঁটা দিল। ‘সঙ্গে একটু চা করি? তবে তোমার মত আদা চা-টা করা এখনও রপ্ত হয়নি আমার।’ সোফা থেকে লাফিয়ে উঠে পড়ল কাবেরি। ‘দাঁড়া, দাঁড়া! আমি করব! কিন্তু এই লাস্ট বার! কাল বিকেলে তোর টার্ন, আমাকে চা করে খাওয়ানোর। আচ্ছা, আমাকে কিন্তু ঠিক পাঁচটায় যেতে হবে। কাল স্কুল খুলবে, তার আগে নবাবপুত্রদের চুল কাটাতে হবে’ – সাবলীল সুরে কথা বলতে বলতে কাবেরি রান্না ঘরে ঢুকে পড়ল। নীরার রান্নাঘরে কোথায় কি থাকে তা কাবেরির নখদর্পণে, যে কেউ দেখলেই বলবে যে তার এ বাড়িতে অবাধ বিচরণ।

রাতুল গত চার বছর ধরে দিল্লীতে আর ততদিন ও এই ফ্ল্যাটেই আছে, নীরাই এ বাড়িতে নতুন সংযোজন। আট মাস আগে যেদিন নীরা রাতুলের সাথে এ বাড়িতে এলো, সোজা সেই কাশ্মীরি গেট থেকে, সেদিন এক তলার মিত্র মাসিমা, তাঁর দুই মেয়ে আর কাবেরি ওকে বরণ করে ঘরে এনেছিল। নিচেকার মেসোমশাই আর মাসিমার সাথে ওদের আর যাই হোক ভাড়াটে-বাড়িওয়ালার সম্পর্ক নয়। মাসিমার মেয়েরাও যখন বাপেরবাড়ি আসে নীরার মনে হয় ওর ননদ এসেছে। নীরা ভালো আছে, ভালোই থাকবে, ও জানে, কিন্তু মাঝেমাঝে বিশ্বাস হয় না। এবার মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে হবে।

নিজের মনের অন্ধকার থেকে বেড়িয়ে কাবেরির দিকে মন দিল। ‘আমার ইন্টারভিউ কল এসেছে স্কুলে, জানো? একটু ভয় করছে – ইন্টারভিউ দিয়ে তো আসি। রাতুল ইজ ভেরী এক্সাইটেড!’

সমর, বুলবুলি, কয়েকটা সন্ধ্যায় ওদের তিনতলার বন্ধ জানালার ভেদ করে ভেসে আসা একটা মৃদু গোঙানি। কাকেই বা বলবে সে এসব কথা? আর তার ফলই বা কী হবে? বুলবুলির কি হবে? আর কাবেরী? সব কিছু তুলে রাখল আরেক দিনের জন্য। হয়তো রাতুলকেই বলবে ও – সব কথা।

*****************************************

‘ব্রতিদা, আর না! না! খুব লাগে! তুমি কথা শুনছ না কেন? ব্রতিদা, নাহ! উফ, না!’ ‘সোনা মেয়ে, একটু আর – তারপর আর ব্যথা লাগবে না’ সেই ফিসফিসে গলার আওয়াজ। ভেজা, তপ্ত ঠোঁটের নোংরা ছোঁয়া। ‘আর একটু, আর একটু … ব্যাস… চুপ, চুপ… আরো আদর করব …’ আবার সেই গলাটা – ‘মনে আছে, এটা আমাদের খেলা। মনে থাকবে? আওয়ার লিটিল সিক্রেট? কাউকে বললে কিন্তু সবাই তোকে খুব বকবে, মা আর বাবা তোকে রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে আসবে। কাকে মা বলবি তখন? কাউকে বলবি না তো? প্রমিস?’ “নীরা! নীরা! …’ অনেক দূর থেকে রাতুলের গলা ভেসে এলো ওর দুঃস্বপ্নের মধ্যে …

“ব্রতিদা? হু ইজ হী? হু ইজ ব্রতিদা, নীরা?” রাতুল ওকে ঝাঁকাল এবার। “কি হয়েছে তোমার? হোয়াই আর ইউ সোয়েটিং? কি হল?” নীরা জানে রাতুল মিথ্যাকে ঘেন্না করে। আর ও তো সত্যি বলতে পারবে না। রাতুল তো ওকে ঘেন্না করবে। যেমন ও নিজে নিজেকে ঘেন্না করে এসেছে। ঘুমের জাল ছিঁড়ে ও ধড়মড় করে উঠে বসল। আচ্ছন্ন অবস্থাটা মানুষের সব থেকে দুর্বল সময়, চোখ রগড়ে ও ঘুমতা তাড়াতে চেষ্টা করল। “জল দেব?” রাতুলকে বেশ চিন্তিত দেখাল। “আজ প্রথমবার নয়, আগেও অনেকবার তোমায় এই রকম গোঙাতে শুনেছি। আই কুড নেভার মেক আউট হোয়াট ইউ সেড। কি হয়েছে নীরা? ইউ সাউন্ডেড লাইক ইউ ওয়ার ইন এ লট অফ পেইন! আই অ্যাম কনসার্নড!” “মাস্ট হ্যাভ বিন অ্যা ব্যাড ড্রীম, কিছু না! শুয়ে পড়ো, প্লীজ” নীরা আবার এলিয়ে পড়ল বিছানায়। “আমাকে একটু জড়িয়ে ধরো না, আমি ঘুমিয়ে পড়তে চাই, প্লীজ”

********************************

“আমার কিছুই বলার নেই। এখন তো জানোই কি হয়েছিল, ব্রতিদা কে, কেন আমরা পুরানো পাড়া ছেড়ে চলে এসেছিলাম সল্টলেকের নতুন বাড়িতে? আমায় একটা কথা শুধু বল, মা বাবাকে ফোন করে সব না জানলে জীবনে ঠকে যাবে মনে করেছিলে,না?”

রাতুল চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে ছিল। ঠান্ডা গলায় বলল, “অন্তত ওনাদের এই কথাটা লুকোনো উচিত হয়নি। মিথ্যা বলে…”

“মিথ্যা বলে তোমাকে একটা এঁটো, ছিবড়ে গছিয়ে দিয়েছে, তাই না? কি বলত তোমাকে? যে তাদের অজান্তে তাদেরই আট বছরের মেয়েকে তারই পঁচিশ বছরের পাড়াতুতো দাদা এক মাস ধরে যেদিন ইচ্ছে হয়েছে সেদিনই ছিঁড়ে খেয়েছে? তার ব্যাথা যন্ত্রণা না শুনে তাকে ব্রুটালি রেপ করেছে? আবার ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রেখেছে? জানার পর কি করতে পেরেছিল তারা? ব্রতীন্দ্রকে ধরে আমার বাবা সপাটে থাপ্পড় মেরেছিল – ব্যাস, তারপর মুখ লুকিয়ে ও পাড়া থেকে চলে যেতে হয়েছিল আমাদের! ব্রতীন্দ্র রায় আজও শ্যামবাজারের একই গলিতে সুখে ঘর সংসার করছে – সে খবর পেয়েছ? আর আমার রেপের গল্প জানলে কি করতে? দয়া করে আমাকে উদ্ধার করতে? যাতে তোমার কাছে আমি দাসী হয়ে থাকতাম? নাকি আমাকে না বিয়ে করে একটা ভার্জিন জোগাড় করতে?”

*****************************************

“নীরাদি, তুমি বছরখানেক আগে সি আর পার্কে থাকতে, না? কোন ব্লকে গো?” ঝুমকি খবরের কাগজ হাতে হন্তদন্ত হয়ে নীরার ঘরে এসে ঢুকল।

“কেন রে?” ক্লান্ত গলায় নীরা জানতে চাইল। এখনও কোনোভাবেই ওর মনের ঘা-টা শুকোয়নি। প্রায় এক বছর পর সবকিছু ছেড়ে, সবকিছু ভুলে থাকার চেষ্টা করে চলেছে নীরা। সেদিন রাতুলের কোনও কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করেনি নীরা – দুটো ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে ওরই কলেজের এক বন্ধুর বাড়ি গিয়ে উঠেছিল। স্কুলের চাকরির ইন্টারভিউ ভালো হলেও বি-এড ডিগ্রি নেই বলে স্কুলের চাকরিটা পায়নি। অগত্যা দিল্লীরই একটা মাঝারি অ্যাড এজেন্সীতে ক্রিয়েটিভ ডাইরেক্টরের চাকরি নিয়ে, হাউজ খাসে একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে আর তিনটি মেয়ের সাথে থাকে। সবাই জানে ও আর রাতুল আলাদা থাকে। কেন, সেটা জানাবার কোনও কারণ খুঁজে পায়নি।

“জে ব্লকের একজন ‘সম্ভ্রান্ত’ ভদ্রলোক, সমর চৌধুরি, পাড়ারই দুটো বাচ্চা মেয়েকে গত দু বছর ধরে রেপ করে চলেছে – কাল ধরা পড়েছে! তুমি কোন ব্লকে থাকতে? তোমার হাজব্যান্ড … মানে …” ঝুমকি প্রশ্নটা চেপে কাগজটা নীরার বিছানার ওপর মেলে ধরল। খবরটা দেখিয়ে বলল, “এই যে! এ সব লোকগুলোকে জেলে না পাঠিয়ে গুলি করে মারতে হয়।” আজ অনেক দিন বাদে নীরার বুকটা একটু যেন হাল্কা হল। কেউ তো শাস্তি পাবে। বুলবুলির কচি মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। তারপর কাবেরির মুখটা মনে পড়তেই ওর দুচোখ ফেটে জল এলো।

সন্ধ্যার মুখে রাতুলের ফোনটা এলো।

**********************************

 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: