RSS

একা এবং সোশাল-নেটওয়ার্ক

10 এপ্রিল

একটা লেখার ঝোঁকে অনেকক্ষণ জেগে আছি আজ, কখন যে মাঝরাত গড়িয়ে গেছে হুঁশও হয়নি। বাকি সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন, সারা বাড়ি নিঝুম। জানালার বাইরে মধ্যরাতের শহরটা রাতের আকাশের মত  অন্ধকার, আশপাশের বাড়িগুলো অন্ধকারের ঘোমটা টেনে ঘুমিয়ে পড়েছে, জেগে আছে শুধু রাস্তার দুধারের নিওন বাতিগুলো। নীচে রাস্তায় কমে গেছে গাড়ির ভিড়, সেই সুযোগে নেড়ির দল সরু গলি ছেড়ে বড় রাস্তা দখল করতে নেমেছে, তাদের চিৎকার মাঝে মাঝে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে রাতের নীরবতাকে। আর শুধু একটা দুটো দলছুট অটোরিকশা রাতের সওয়ারির খোঁজে এখনও রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে।

ঘরের আধো অন্ধকারে আমার নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্যে টেলিভিশনটা মিউট করে চালানো। এদিকে  মগজের অবস্থা “খাচ্ছে, কিন্তু গিলছে না” – লেখাটা এক জায়গায় এসে থেমে গেছে – মনও আর বশে নেই, সেও উড়ি উড়ি, এই সময়ে আর লেখায় বসবে না।

আমি কম্পিউটারের ওয়ার্ড ডকুমেন্টটা বন্ধ করে ইন্টারনেটের ব্রাউসারটা খুললাম। অভ্যাসবশত ফেসবুক আর টুইটারে লগ ইন করে চোখ গেল স্ক্রিনের কোনায় ঘড়ির দিকে – রাত দুটো! কিন্তু ল্যাপটপের এল সি ডি স্ক্রিনের ওপারে দেখি এখনও বয়ে চলেছে এক সমুদ্র নিস্তব্ধ কথার স্রোত। পূর্ব গোলার্ধের বেশিরভাগ মানুষই যখন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছে, কিছু নিশাচর তখনও জেগে। তবে শুধু জেগে থেকে ক্ষান্ত নয় তারা, পুরদস্তুর আড্ডার আসর চালিয়ে যাচ্ছে নিজেদের মধ্যে, কেউ আড়ি পাতছে অন্যের কথায়, কেউ বা ঝগড়ায় ব্যস্ত, কেউ ব্যস্ত নিজের কবিতা পড়তে, একজন ব্যস্ত নিজের সাম্প্রতিক ফরেন ট্রিপের অ্যালবাম ফেসবুকে লাগাতে, তো অন্যজন ব্যস্ত অচেনা ফেসবুক বন্ধুর জীবনের ঘনঘটা ভরা অ্যালবাম থেকে তাকে একটু চিনতে। টুইটারে বয়ে চলেছে তর্ক-বিতর্কের ঝড়, রাতজাগা এক সুন্দরীর ব্যর্থ প্রেমের প্রলাপ, বিশিষ্ঠ এক ফিল্মস্টারের ফিলসফি ক্লাস, সিনেমার সমালোচনা, রাজনিতি, কূটনীতি, রান্নাবান্না, লেখকের স্মৃতিচারণ, স্কচ, রাম, জিনের ফোয়ারাও। আজ মাঝরাতে জেগে থেকে এক নতুন জগতের হদিস পেলাম।

মন শুধালো, ‘আচ্ছা, এদের পাশের মানুষগুলো কি নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে, নাকি এরা সবাই একা, অবিবাহিত, পিজিতে  বা হস্টেলে থাকা কম বয়সী ছেলে মেয়ে? ঘর ছেড়ে দূর শহরে চাকরি করে বুঝি? এদের ঘর বাড়ি নেই, সংসার নাই, কাল সকালে উঠে অফিস যেতে হবে না, ছেলে মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে হবে না? এত রাতে এরা জেগে আছে কেন? এদের ঘুম পায় না বুঝি, ইনসমনিয়াক?’ বাতুল মনকে দেবার মনের মত কোন উত্তর খুঁজে পেলাম না।

আধুনিক নগর-সভ্যতার অভিশাপ আর জরা-ব্যাধি-মড়ক নয়, তার চেয়েও ভয়ঙ্কর, অদৃশ্য এক শত্রু, একাকীত্ব। নিঃসীম সমুদ্রে ভেসে বেড়ান দ্বীপ আমরা। দিনভর কেরিয়ারের দাসত্ব, ই এম আই, স্কুল ফি, গাড়ির লোন, সংসারের নানা মাথাব্যাথা। ফুরসৎ কথাটা বাংলা-ঈংলিশ মোটা ডিকশনারির পাতার মাঝে হারিয়ে গেছে। বন্ধু আছে, কিন্তু সময় নেই। আবার কখনো সময় থাকলেও মনের মত বন্ধু থাকে না। বন্ধু থাকে তো মনের মানুষ পাওয়া যায় না। যেন আমরা প্রতি পল আরও একটু বেশি নিঃসঙ্গ, আরও একা হয়ে পড়ছি।  মানুষের একাকীত্বের কি কারণ? নানা মুনির নানা মত। এই একটা অসুখ আমাদের প্রতি নিয়ত গ্রাস করে চলেছে, কিন্তু তার কোন ওষুধ খুঁজে পাওয়া যায়নি এখনও।

আজ মাঝরাতে ব্রাউসারের পাতায় পাতায়, ফেসবুকের আপডেটে, টুইটারের টাইমলাইনে, অর্কুট, মাই স্পেস, গুগুল প্লাস, পিন্টারেস্ট- এর মত “সোশাল নেটওয়ার্ক”এর দেয়ালে দেয়ালে দেখলাম নিদ্রাহীন, স্বপ্নহীন এক জনস্রোত – নানা জন, প্রচুর কথা, হাজার প্রশ্ন, মান-অভিমান, ভাব, ভালবাসা, হিংসা, ঝগড়া – ঠাণ্ডা স্রোতের মত নীরবে বয়ে চলেছে ঠাণ্ডা কাঁচটার ওপারে – একাকীত্বের নিঃশব্দ কোলাহল। সে জগতে কেউ ঘুমোয় না, কেউ স্বপ্নও দেখে না। এত কথার, এত আওয়াজের মাঝে শুধু একটা কথাই শুধু সবাই নিঃশব্দে চিৎকার করে বলে চলেছে, “আমি একা, আমি একা, আমি একা”।

তাহলে নাগরিক একাকীত্বের একমাত্র ওষুধ কি এই ছায়ার মায়া জগৎ, এই ‘সোশাল নেটওয়ার্ক’ ? ছায়া মানবের সাথে ছায়া মানবীর কথোপকথন, বন্ধুত্ব, প্রেম, অনুরাগ, বিরাগ? যেন এক অদৃশ্য তরঙ্গ বয়ে চলেছে মহাদেশ থেকে মহাদেশে, ছুঁয়ে চলেছে জীবন থেকে জীবনে, বন্ধুত্ব গড়ছে, দ্বীপের মত ভেসে বেড়ান মানুষগুলোর মাঝে গড়ে উঠছে সেতু। এদের মধ্যে এমন অনেকেই আছে যারা মনে করে যে এই ছায়া সরণির পথে পাওয়া বন্ধু রক্ত মাংসের মানুষের চেয়ে অনেক ভালো, দুঃখ দেবে না, ঠকাবে না, বন্ধুত্বের পরিবর্তে হয়তো প্রতিদানও চাইবে না। এমনই ভালো। ‘লগ ইন’ করে হাত বাড়ালেই বন্ধু আর ‘লগ আউট’ করে কম্প্যুটার অফ করলেই সব দায়বদ্ধতা শেষ।

কিন্তু এই জগত কি ওষুধ, নাকি অসুখ? যে একাকীত্ব কাটানোর জন্য এই একা মানুষগুলো দিনরাত এক করে ঐ মায়াজালে জড়িয়ে আছে, সেই একাকীত্ব কি কাটছে? নাকি বেড়ে চলেছে মানুষে মানুষে ব্যাবধান? ছায়া বন্ধুর টানে কি ভুলে যাচ্ছে না সে আসল বন্ধুকে? সে কি আরও একা হয়ে পড়ছে না?

 
5 টি মন্তব্য

Posted by চালু করুন এপ্রিল 10, 2012 in বিভাগবিহীন

 

5 responses to “একা এবং সোশাল-নেটওয়ার্ক

  1. Avik Ghosh (@AvikG)

    এপ্রিল 10, 2012 at 16:28

    Osadharon! Pore khub bhalo laglo 🙂

     
  2. Gablu (@_Gablu)

    এপ্রিল 10, 2012 at 19:54

    অসাধারন লেখা দিদি। খুব সুন্দর। পড়ে ভালো লাগল।

     
  3. Eros Bonazzi (@ErosBonazzi)

    এপ্রিল 11, 2012 at 23:40

    Khub khub beshi bhalo legeche. Khub basto, khub shotto, khub gobheer. Kintu dekhlam onnoder moto tumi o rat 2ta jege acho bole ei shob dekhecho. Mone hoe shobar obostha ek.

     
  4. Sidhu Jethu (@somonline)

    এপ্রিল 12, 2012 at 16:51

    সোশাল নেটওয়ার্ক এর একাকীত্ব কেমন যেন ‘সর্ষের মধ্যে ভূত’ এর কথা মনে করায়. লেখাটি খুব ভালো লাগলো.

     
  5. Aniruddha

    এপ্রিল 12, 2012 at 21:49

    সুন্দর লেখা; মানুষকে ভাবাবে৷ সামাজিক উর্ণাজাল (অবশ্যই বৈদ্যুতিন) যখন ছিলনা, একলা লাগা তখনও ছিল৷ মনস্তত্ত্ব- ও সমাজতত্ত্ব-বিদরা জানেন, একলা লাগার উপাদান পাঁচটা: ১. সামাজিক স্তরভেদ (উঁচুতলায় বেশি), ২. শিক্ষার মান (যতো বেশি, ততো বেশি), ৩. পারিবারিক কাঠামো (যৌথ পরিবারে কম, একক পরিবারে বেশি), ৪. কতটা অবসর আছে হাতে (বেশি থাকলেই বিপদ), আর ৫. ব্যস্ত থাকার কটা বিকল্প আছে (ইমেল কিংবা ফিমেল, অবয়বপুস্তক, শৃঙ্খলাবদ্ধ, কূজন,
    বিজন … বেশি থাকার হ্যাপা অনেক! কপোলে রসনা রেখে লেখার জন্য অগ্রিম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি!

     

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: