RSS

হায় মুম্বই!

07 সেপ্টে.

Read the original post on পথে প্রবাসে

সন্ধে ৬টা-সাড়ে ৬টা। অন্ধকার ঘনিয়ে আসা শহরটার বুকে একটা, একটা করে আলো জ্বলে উঠছে, রাস্তাঘাটে সারা দিনের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম শেষে ঘরে ফেরার তাড়া, ভিড়। ট্রেনগুলো একের পর এক দাদার, ভি টি, চার্নি রোড, মুম্বই সেন্ট্রাল, চার্চগেট, ক্যারি রোড, কটন গ্রিন – সব স্টেশনগুলো ছেড়ে রওনা দিচ্ছে মুলুন্দ, থানে, কান্দিভেলি, বোরিভেলি, মীরা রোড, ভায়ান্দর, ভিরার – শহরটার চারপাশে ছড়িয়ে পড়া গ্রেটার মুম্বইয়ের কোণায়, কোণায়। বাস স্টপগুলোতেও উপচে পড়া মানুষ, বাড়ি ফেরার তাড়ায় বাসের নম্বর খুঁজছে উদগ্রীব চোখে। এটাই সন্ধে হয়ে আসা বাণিজ্য নগরী মুম্বইয়ের রোজকার পরিচিত ছবি।

১৩ই জুলাই এই অতি চেনা ছবিটা একটু ঝাপসা হয়েছিল ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে। হঠাৎ ঝলসে উঠল ছবিটা। কিন্তু বিদ্যুতের চমকে নয়। আবার বোমা বিস্ফোরণ, একবার নয়, বারবার তিন বার, শহরের মাঝে তিন জায়গায়। জাভেরি বাজারের সরু গলি আর অপেরা হাউসের অন্ধ, কানা গলি সেদিন সন্ধ্যের ঝির ঝিরে বৃষ্টির মধ্যেও সরগরম ছিল – হঠাৎ বোমার আওয়াজ, ভয় পাওয়া মানুষের চিৎকার, আহত মানুষের কাতরানি আর মৃত মানুষের রক্ত – সব মিলে মিশে হয়ে উঠল আরেক দুঃস্বপ্নের রাত। এই হিরের বাজারের যে গলিগুলোতে দিনের বেলা রোদের আলো ঢুকতে সাহস পায় না – সেই গলির আনাচ কানাচ ভরে গেল ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা বোমায় ছিন্নভিন্ন রক্তাক্ত শরীর আর লক্ষ লক্ষ টাকার হিরের কুঁচিতে। দাদারে কবুতর খানার কাছে অ্যামোনিয়া নাইট্রেট বোমার আঘাতে দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া বাস স্ট্যান্ডটার সামনে তখন খবরের চ্যানেলের টিভি ক্যামেরা আর খাকি উর্দির ভিড়। রাত বাড়তেই এল আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি, যেন প্রকৃতিও কেঁদে উঠল মানুষের এই হিংসা দেখে, চোখের জলে মুছিয়ে দিতে চাইল অসহায় এই শহরটার বুক থেকে মৃত্যুর গ্লানি।

কিন্তু পরের দিন সকালবেলা মুম্বইয়ের সেই পুরনো রূপ। ভোর থেকে রাস্তায় দুধওয়ালা, কাগজওয়ালাদের সাইকেলের টিং টিং, বাজার সরগরম বাজারুদের দরদামে, বাসে ট্রেনে আগের দিনের চেয়ে বুঝি একটু বেশি ভিড়। যদিও চেনা হিরে পট্টি সেদিন শুনশান, জাভেরি বাজার আর অপেরা হাউসের রাস্তায় খাকির ভিড় বেশি, তখনও কিছু সাংবাদিক ঘুরছে ‘এক্সক্লুসিভ’ নিউজের লোভে। দাদারে বিস্ফোরণের প্রকোপ ছিল কম তাই সেখানে কৌতূহলীদের ভিড় বেশি। ব্যাস, এই পর্যন্তই।

নাহ, এবার আর কোন অযথা শোক প্রকাশ, কোনও পথসভা, কোনও মিছিল, মিটিং, এক মাইল লম্বা পোস্টার লিখন, গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ায় মোমবাতি জ্বালিয়ে শোক সমাবেশ, কিচ্ছু হল না। অবাক হলাম বেশ। রাত কাটার সাথেই মুছে গেছে গত রাতের দুঃস্বপ্ন? এই কি মুম্বইয়ের সেই ‘স্পিরিট’? যা কিছুই হোক না কেন, ধুলো ঝেড়ে উঠে পড়ে মুম্বই, চলতে শুরু করে আবার নিজের তালে, মুহূর্তে কাটিয়ে ওঠে শোক। জীবন যুদ্ধে সামিল হয়ে আবার! নাকি প্রাণহীন এই শহর আর এই শহরের মানুষগুলো?

কেউ বলল, “এখানে মানুষরা বড় স্বার্থপর। কটা লোক মরেছে বলে কারোর কিছু আসে যায় বলে তো মনে হয় না”

আরেক জনের বক্তব্য, “যেখানে দিনে দুপুরে আন্ডার ওয়ার্ল্ডের গুলির নিশানা হয় মানুষ,  ফাইভ স্টার হোটেলে ঢুকে টেররিস্ট গুলি চালিয়ে লোক মারে, ঠগ জোচ্চোরে রাজ্য ভরে গেছে, এত কোরাপশন – সেই শহরের বাসিন্দারা যে স্বার্থপরের মত মুখ ঘুরিয়ে থাকবে তাতে আর আশ্চর্য কিসের? ওই মরা মানুষগুলোর সাথে শহরটাও মরতে বসেছে”

“১৩ই জুলাই, ১৩/৭ ইতিহাসের পাতায়ে আরেকটা কালো দাগ মাত্র। ২৬/১১-এর পর লাইন লাগাল ১৩/৭, এর পর নতুন কোন তারিখ বসবে কে জানে?”

“আরে বাবা, এটা তো আর আমেরিকা নয় যে আমাদের প্রেসিডেন্ট আতঙ্কবাদের বিরুদ্ধে, সারা তৃতীয় বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দেবে, অন্য দেশকে মিথ্যা ফাঁসিয়ে মিসাইলের ঝড়ে মাটিতে মিশিয়ে দেবে। এ হল মুম্বই, বলিউডের ক’জন নায়ক নায়িকা মোমবাতি হাতে জড় হবে গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ায়, জ্বালাময়ী ভাষণ দেবে! ব্যাস, সব ঠান্ডা। আবার কদিন বাদে আবার কোনও অলি গলি, বাজারে, স্টেশনে, বাস স্ট্যান্ডে আবার ফাটবে বোমা, মরবে কটা নিরীহ মানুষ আর তারপর  মুম্বই আবার ধুলো ঝেড়ে উঠে ফিরে যাবে নিজের তালে।

তাহলে সত্যিই কি এই স্বপ্নের নগরী, এই বাণিজ্য নগরী প্রাণহীন, পাষাণ? সত্যি কি এখানকার মানুষ এতটাই স্বার্থপর, যে এমন ভয়াবহ মৃত্যুও তাদের নাড়া দিতে পারে না?

কিন্তু, একবার কি ভেবেছেন তাদের কথা? ওই যে ওরা, যারা রোজ সকালে দশ ফুট বাই দশ ফুটের ‘চওল’-এর ঘরটা ছেড়ে তিনটে ট্রেন পালটে ওই জাভেরি বাজারে বা অপেরা হাউসের আশে পাশে ছোট ছোট কাজ করে, বা যারা দিন মজুর বা ওই স্পটবয়টা, রোজ হাজার ওয়াটের আলোয় কোটি কোটি টাকার সিনেমা রোশনাই করে, সেই দোকানদাররা যাদের জীবনের মূলধন দেওয়ালের গায়ে লাগান ছোট্ট টিনের ঘরটা বা ঠ্যালাটা, যে লোকটা রোজ অটো চালিয়ে নিজের সংসারের পেট চালায় আর হপ্তা দিয়ে হাবিলদারের পেটও ভরায়, তাদের কথা। মুম্বই মানে তো এরাই, ৭৫% এই সব মানুষ, ভোর থেকে রাত অব্দি যারা অবিরত ব্যস্ত পেট ভরার তাগিদে।

এই মানুষগুলোর দিন আনা দিন খাওয়ার রোজনামচায় ছেদ পড়া মানে  একদিনের রোজগার বন্ধ। সন্ত্রাস তো তাদেরই ভাতের হাঁড়িতে। আজ বেঁচে আছে, কাল অন্য কোনও গলির বাঁকে, অজানা কোনও বাস স্টপে লুকানো বোমের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হতেই পারে। এই মানুষ গুলিই তো প্রতিবার মুখ  থুবড়ে পড়ে, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে, ধুলো ঝেড়ে, ক্ষতে ওষুধ লাগিয়ে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পথ চলতে আরম্ভ করে। আর তো কোনও উপায় নেই। ভয় পেয়ে পেয়ে আজ তারা তাই ভাবলেশহীন, ভয় শূন্য, হতাশ হতে হতে তারা পাথর। পেটের তাগিদে তাড়িত, আঘাতে জর্জরিত মুম্বই আর আশা করে না যে আমূল ভাবে কোনও কিছু বদলাবে। আপিলও করে না বা নালিশও করে না প্রশাসনের কাছে এই দুরবস্থা নিয়ে। জানে যে ‘এই ভাবে আর কতদিন সন্ত্রাসের শিকার হব’? প্রশ্নটার কোনও উত্তর নেই। রোজ বোমার আঘাতে মৃতদের দাহ করতে করতে মুম্বই আজ নিঃসাড়, নির্লিপ্ত। শিখে গেছে আজ মৃত্যুর সঙ্গে পথ চলতে।

 
 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: