RSS

‘পরিবর্তন’, কেবলই একটি বিশেষ্য

07 সেপ্টে.

Read the original post on পথে প্রবাসে

সন্ধে ঘনিয়ে এসেছে, বাইরে অন্ধকার নেমেছে অন্য দিনের চেয়ে একটু আগেই। মেঘলা আকাশ, দূরের ঝিল আবছায়া, কিন্তু বারান্দা পেরিয়ে, দরজা ডিঙিয়ে আজ চাঁদের হাট বসেছে আমার ঘরে। আমার পতিদেব সমেত চার তার্কিক ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে তুফান তুলেছে।

সোফার কোণে বসে চুপচাপ শুনছিলাম নানা যুক্তি তর্ক, পরিবর্তনের পক্ষে, বিপক্ষে। পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী, পরিবর্তনশীল সমাজের গতি রোধ করা অসম্ভব, কেন চাই পরিবর্তন, কারা পাল্টাচ্ছে, কারা পালটাতে ভয় পায় – নানা কথা, নানা মত।

শুনতে শুনতে, কখন কে জানে, আমি পৌঁছে গেলাম আমার ছোটবেলার সেই দিনগুলোতে। মধ্য কলকাতার অলি গলি তস্য গলির মাঝে ছিল আমার পাড়া । গরম কালে, সন্ধে বেলায় ঠিক এরকম সময়ে কি সুন্দর ঠাণ্ডা হাওয়া বইত, রাতে ঝুড়ি বোঝাই জুঁই ফুলের মালা নিয়ে বাড়ি বাড়ি ফিরত ফুলওয়ালা, দোতলার বারান্দার কোণায় বসে আমার ঠাকুর্দা এক মনে শচীন কর্তার গান শুনতেন, মাঝে মাঝে কাকার ঘর থেকে ভেসে আসত সরোদের মিঠে সুর, জানালায় দুলতে থাকা পর্দার ছায়ায় আমি দেখতাম দত্যি দানবের লড়াই| আর কখন তারপর রাতের কোলে মাথা রেখে হারিয়ে যেতাম সাত সমুদ্র তেরো নদীর কূলে, পক্ষীরাজ ঘোড়ায় সওয়ার রাজপুত্তুরের দেশে। তখনও, সেই ফ্রক পরা, ঝুঁটি বাঁধা পাঁচ বছরের মেয়েটা – আমি – আনচান করতাম বড় হব, পালটে যাব বলে। মন ছটফট করত কবে ফ্রক ছেড়ে ওড়না ওড়ানো সালোয়ার কামিজ পড়ার জন্যে| লম্বা চুলে বেণী বাঁধব, আমার চেয়ে বয়সে বড় দাদা দিদিদের মত চোখে চশমা এঁটে মোটা মোটা বই ঘাঁটব, কবে মা আর দুধ খাওয়ার জন্য জোরাজুরি করবে না – এই রকম নানান গুরুত্বপূর্ণ ‘পরিবর্তন’-এর জন্য।

কিন্তু সেই বয়সে কল্পনাও করতে পারিনি আসলে পরিবর্তন কাকে বলে। আমি জানতাম আমাদের বারান্দার সামনে পাহাড়ের মত বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বনেদি মল্লিকবাড়ির ছাদের ওপারে চিরকালই লুকিয়ে থাকবে আকাশটা| আমার ঠাকুরদা রোজ বিকেলেই ঠাকুমার সঙ্গে চা, মুড়ি, চিনেবাদাম খাবেন আর রাতে বারান্দায় বসে পেসেন্স খেলবেন শচীন কর্তার গান শুনতে শুনতে, প্রতি শনিবার সন্ধে হলেই মা বাবার সঙ্গে সিনেমা যাবে, আমার কাকা সরোদে নতুন নতুন সুর তুলবে, বর্ষা হলেই গলির মোড়ে এক হাঁটু জল জমবে| পাশের বাড়ির ম্যাও দাদু চিরকাল তাঁর বিলেতে থাকা ছেলের গল্প শোনাবে আর শেষ বয়সে তার কাছে বিলেতে থাকার স্বপ্ন দেখবে, হরিদাদা রোজ ভার ভার জল তুলে আমাদের চৌবাচ্চা ভর্তি করবে। আমি জানতাম, আমি বড় হলেও আমার চারপাশে কোনও কিছু বদলাবে না, অলস বড় রাস্তাটা ধরে এমনই রোজ স্কুলে যেতে হবে, এমনকি নতুন আসা টেলিভিশনটাও সাদা কালোই থেকে যাবে।

হঠাৎ একটা কথার টানে এক দৌড়ে ফিরে এলাম বাস্তবে, আমার প্রবাসের ড্রয়িং রুমে। এক তার্কিক তাল ঠুকে বলল, “আসলে আমরা পরিবর্তনকে ভয় পাই, তাই বদলাতে চাই না আমরা। আর বাঙালিরা তো জগদ্দল পাথরের গায়ে শ্যাওলার মত জমে আছে, তারা ‘পরিবর্তন’ নামের বিশেষ্যটির সংজ্ঞা ভুলে গেছে”।
তর্কের এই অ্যাঙ্গেলটার সঙ্গে এক মত হতে পারলাম না। গত তিন দশকে কত কিছুই তো পালটাল আমার সামনে। আমার ঠাকুরদা রেকর্ড প্লেয়ার আর রেডিওর মায়া ত্যাগ করে ধরলেন টিভি। ছোটবেলার সেই অজগরের মত এলিয়ে পড়ে থাকা সেন্ট্রাল এভিনিউকে ক্ষত বিক্ষত করে, বুকে পিলার ঠুকে ঠুকে কলকাতার পাতালে চলতে শুরু করল রেল, দলবদলের বোমাবাজিতে মাতোয়ারা হল অলি গলি, রাস্তার মোড়, ইংরেজির হল ডিমোশন, ভিড়ে ভরে উঠল শহর, সাদা কালো থেকে বাড়ির টিভিটাও একদিন হয়ে গেল রঙিন। আর আমি? ঝুটিঁ থেকে বিনুনিতে প্রমোশন পেলাম আর মোটা, মোটা বইয়ের মাঝে হারিয়ে গেলাম।

এত কিছুর পরেও কি করে বলি যে বাঙালি বদলায়নি? কে বলে যে বাঙালি পরিবর্তন চায় না? দলে দলে শহর, গ্রাম উজাড় করে এই যে আমরা দেশে, বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছি, কেন? মাত্র বছর কুড়ি আগেও যে ঠোকাঠুকি, চুলোচুলি, ঝগড়াঝাঁটির এক্কান্নবর্তী সংসার ছিল, তা আজ ‘ছোট পরিবার, সুখী পরিবার’ হয়েছে, কেন? বড় দোমহলা বাড়ির বিলাসিতা ছেড়ে আজ সবার কাম্য ‘টু বেডরুম, ডাইনিং, হল, কিচেন’ – কেন? পুরোনো, প্রাসাদোপম বাড়ি, বাজার ভেঙে চাই অত্যাধুনিক ‘মল’, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর| চওড়া রাস্তার বুকে গজিয়ে তুলি উড়ালপুল – কেন? বাঙালি মতে সাতপাকে বেঁধে, অগ্নিসাক্ষী করে বিয়ে তো হবেই, তার আগে চাই পাঞ্জাবি ‘মেহেন্দি’ আর ‘সঙ্গীত’-এর জলসা| এসব পরিবর্তন নয়? হেমন্ত, মান্না, শ্যামল, সন্ধ্যা, আরতি ছেড়ে আমরা শুনি জীবনমুখী গান। সত্যজিৎ, ঋত্বিক ঘটক ছেড়ে ‘বেদের মেয়ে জোসনা’, ‘পাগলু’-র রসে মজে যাই। এসবও আমূল পরিবর্তন।

হয়তো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের ‘পরিবর্তন’-টা হয়েছে উন্নতির বিপরীতে, আবার অনেক সময় আমাদের এই বদলান চাল-কে নিন্দুকেরা নাম দিয়েছ ‘যত্ত সব অপসংস্কৃতি’।না হয় জাতি হিসেবে আমরা সামনের সারি থেকে পিছতে, পিছতে একেবারে পিছনের সারিতে এসে দাঁড়িয়েছি।

আমরা “হ্যাঁ” বলতে গিয়ে না হয় বলে ফেলি “না”। হয়তো‘পরিবর্তন’ কথাটা আমাদের চিন্তায় ফেলে দেয়, ভয় দেখায়। তারপর সেই দুশ্চিন্তা নেয় অনীহার চেহারা। জাতিগত উন্নতির কথা হয়ত ভাবতাম একদিন আমরা, সেই চিন্তাও আমরা পালটে ফেলেছি। আজ আমরা ভাবি,‘কি হবে বদলে, কিছুই তো পালটাবে না’। তাই বলে পরিবর্তন আমাদের হয়নি ভাবাটা ভুল। পোশাকে আশাকে, আসবাবপত্রে, ঘর বাড়িতে, চুলের ছাঁটে, কথার ঢঙে, সামাজিক রীতি নীতিতে– প্রচুর পাল্টেছি নিজেদের। এবার শুধু ‘পরিবর্তন’ নামক বিশেষ্যটি ক্রিয়া রূপে দরকার নিজেদের কিছু চিন্তা ভাবনায়। তাই না?

 
 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: